বিপদ যখন আসে তখন সব দিক দিয়েই আসে—ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে এই প্রবাদটিই আজ সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। পশ্চিমা দেশগুলোর ফাঁপা আশ্বাসে বুক বেঁধে আজ ইউক্রেন যে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে, তা আধুনিক ইতিহাসের এক চরম শিক্ষা। কেন বিশাল সামরিক শক্তির অধিকারী রাশিয়া আজ বিশ্বমঞ্চে অপ্রতিরোধ্য, আর কেন ইউক্রেন কেবল পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তথাকথিত মূলধারার মিডিয়া যখন একপাক্ষিক খবর প্রচার করছে, তখন আমরা তুলে ধরবো পর্দার আড়ালের সেই সত্যগুলো।
রাশিয়া কোনো সাধারণ দেশ নয়, এটি একটি বিশাল সাম্রাজ্য এবং ঐতিহ্যের নাম। ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া সব সময়ই নিজের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ব্যাপারে আপসহীন। ন্যাটোর পূর্বমুখী বিস্তার রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য যে সরাসরি হুমকি তৈরি করেছিল, তার জবাব দেওয়া রাশিয়ার জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা। রাশিয়া কেবল নিজের সীমানা রক্ষা করছে না, বরং একটি বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে যেখানে পশ্চিমা আধিপত্য থাকবে না।
অন্যদিকে ইউক্রেনকে যদি দেখেন, তবে দেখবেন এটি একটি ট্র্যাজেডির নাম। ২০১৪ সালের পর থেকে ইউক্রেনকে ব্যবহার করে রাশিয়াকে দুর্বল করার যে নীল নকশা ওয়াশিংটন তৈরি করেছিল, ভলোদিমির জেলেনস্কি সেই পরিকল্পনার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছেন। রাশিয়ার মতো বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী থাকা সত্ত্বেও কিয়েভ কেন সুদূর আটলান্টিকের ওপারের দেশগুলোর কথায় নাচছে? এর উত্তর স্পষ্ট—ইউক্রেন আজ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং ন্যাটোর 'প্রক্সি' হিসেবে যুদ্ধ করছে। তাদের নিজস্ব কোনো কৌশল নেই, নেই কোনো স্থায়ী লক্ষ্য। কেবল ঋণের বোঝা আর আধুনিক মারণাস্ত্রের পরীক্ষা ক্ষেত্র হিসেবে তারা ব্যবহৃত হচ্ছে।
যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার রণকৌশল অত্যন্ত গভীর। রাশিয়া কেবল আক্রমণ করছে না, বরং তারা লক্ষ্য অর্জনে ধৈর্য ধরছে। রাশিয়ার হাইপারসনিক মিসাইল থেকে শুরু করে তাদের বিশাল সাবমেরিন বহর—সবই প্রমাণ করে যে রাশিয়া চাইলে যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তারা চায় না সাধারণ বেসামরিক মানুষের ক্ষতি হোক। বিপরীতে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলা বা পশ্চিমা সরঞ্জামের আস্ফালন আসলে একটি মরিয়া চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। পশ্চিমা মিডিয়া রাশিয়ার ব্ল্যাক সি ফ্লিট বা নৌবহরের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে যতই চটকদার হেডলাইন দিক না কেন, বাস্তবতা হলো রাশিয়ার মূল শক্তি এখনো অক্ষত। তাদের রিজার্ভ ফোর্স এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামনে ইউক্রেনের টিকে থাকা অসম্ভব।
পশ্চিমা দেশগুলো ভেবেছিল স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞার জালে রাশিয়া পিষ্ট হবে। কিন্তু পুতিনের কৌশলী নেতৃত্বে রাশিয়া আজ আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাশিয়া আজ চীন, ভারত ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে। রাশিয়ার গ্যাস ও জ্বালানির ওপর ইউরোপের যে নির্ভরতা, তা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে রাশিয়াকে ছাড়া আধুনিক বিশ্ব অচল। ইউক্রেন যেখানে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, রাশিয়া সেখানে নিজের অর্থনীতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলছে।
জেলেনস্কি সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় না গিয়ে যে একগুঁয়েমি দেখাচ্ছে, তার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ইউক্রেনীয়দের। ন্যাটোর প্রলোভনে পড়ে আজ ইউক্রেন তার অর্ধেক জমি হারাতে বসেছে, লাখ লাখ মানুষ দেশান্তরী। অথচ রাশিয়ার দাবি ছিল অত্যন্ত সাধারণ—ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা এবং ডনবাসের মানুষের নিরাপত্তা। এই যৌক্তিক দাবিগুলো না মেনে ইউক্রেন আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেনীয় নেতৃত্বের এই অদূরদর্শিতা তাদের আগামী প্রজন্মের কাছে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে আজ রাশিয়ার পাল্লা ভারী। আফ্রিকা থেকে ল্যাটিন আমেরিকা—সবখানেই রাশিয়ার প্রতি সমর্থন বাড়ছে। রাশিয়ার এই জয় কেবল ভূখণ্ডের জয় নয়, এটি একটি আদর্শের জয়। পশ্চিমা 'ইউনিপোলার' বা একমেরু বিশ্ব ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে রাশিয়া আজ ন্যায়ের পক্ষে লড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ আসলে বিশ্ববাসীর চোখ খুলে দিয়েছে—কারা সত্যিকারের বন্ধু আর কারা কেবল অস্ত্র ব্যবসার জন্য যুদ্ধ জিইয়ে রাখে।
ইতিহাস সবসময় বিজয়ীদের কথা বলে। আর বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত বলছে, রাশিয়া তার লক্ষ্য অর্জনে অবিচল এবং সফল। ইউক্রেন যে ভুল পথে পা বাড়িয়েছে, সেখান থেকে ফিরে আসা এখন প্রায় অসম্ভব। পশ্চিমা মদত যেদিন ফুরিয়ে যাবে, সেদিন ইউক্রেনের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর পালানোর পথ থাকবে না।
রাশিয়া কেবল একটি দেশ নয়, রাশিয়া একটি বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের কাছে আজ ন্যাটোর সমস্ত আস্ফালন বৃথা প্রমাণিত হচ্ছে।
দর্শক, আপনাদের কী মনে হয়? ইউক্রেন কি আদৌ পশ্চিমা সাহায্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবে? নাকি রাশিয়ার এই অদম্য শক্তির কাছে আত্মসমর্পণই তাদের একমাত্র পথ? আপনার মতামত কমেন্ট বক্সে জানাবেন।
