আপনি কি জানেন, কেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পরাশক্তিগুলো একটি দেশের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে ভয় পায়? কেন মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তেহরানের এই গোপন অস্ত্র? আজ আমরা উন্মোচন করব সেই সত্য, যা পশ্চিমা মিডিয়া আপনার কাছে গোপন রাখে। ইসরায়েলের দম্ভ চুরমার করতে ইরান কীভাবে তৈরি করেছে এক অপরাজেয় দেওয়াল—চলুন জেনে নিই সেই শিহরণ জাগানিয়া ইতিহাস!

প্রবাদে আছে, "বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘেই খায়।" আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে ইরান এই প্রবাদটিকে সত্য প্রমাণ করেছে। তারা জানে যে, শত্রুর ভয় যদি মনে গেঁথে দেওয়া যায়, তবে যুদ্ধ না করেই অর্ধেক জয় নিশ্চিত করা সম্ভব। আজ ইরান কেবল একটি দেশ নয়, বরং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক অপরাজেয় দুর্গের নাম।

আমরা যদি বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকাই, তবে দেখব 'আরব বিশ্ব' নামে একটি বিশাল ভূখণ্ড রয়েছে। কিন্তু এই বিশাল ব্লকের কোনো ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য 'ন্যাটো'র মতো শক্তিশালী সামরিক জোট আছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো আজ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।

এমন এক নৈরাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় ইরান উপলব্ধি করেছে যে, নিজের সক্ষমতা ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের মতো সংঘাতময় অঞ্চলে যেখানে প্রতি মুহূর্তে ষড়যন্ত্র চলে, সেখানে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কেবল বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ইরান তার অদম্য মেধা ও সাহসের জোরে আজ গড়ে তুলেছে এক বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার।

ইরানের এই অভাবনীয় উন্নতি দেখে আজ ইসরায়েল এবং তাদের পশ্চিমা দোসরদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তারা ভালো করেই জানে, ইরানকে সরাসরি আক্রমণ করা এখন আত্মহত্যার শামিল। তাই তারা কখনো অবরোধের নামে, আবার কখনো আলোচনার টেবিলে ইরানকে তার এই সুরক্ষা কবজ ত্যাগের জন্য চাপ প্রয়োগ করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

কিন্তু তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনো আলোচনার বিষয় নয়। এটি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় লড়তে হয়, সেখানে ইরান কেন তার হাত-পা বেঁধে শত্রুর সামনে দাঁড়াবে? আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ব্যর্থ হয়েছে ইরানকে দমাতে।

আসলে প্রশ্ন হলো, ইরান কেন ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে এত অনড়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিষ্ঠুর বাস্তবতায়। পৃথিবীতে এমন কোনো নিরপেক্ষ শক্তি নেই যা কোনো আক্রান্ত দেশকে নিরাপত্তা দেবে। জাতিসংঘ বা নিরাপত্তা পরিষদ কেবল বড় শক্তিগুলোর ভেটো ক্ষমতার পুতুল মাত্র। এখানে যার লাঠি তার মাটি—এটাই হলো চরম সত্য।

নিরাপত্তার জন্য অন্যের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করা কেবল ব্যয়বহুল নয়, বরং এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ইতিহাসে বহু দেশ পরাশক্তিদের গ্যারান্টির ওপর ভরসা করে আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন থেকে শুরু করে লিবিয়া—সবই আমাদের চোখের সামনে উদাহরণ। ইরান সেই ঐতিহাসিক ভুল করতে নারাজ এবং তারা স্বনির্ভরতাকে বেছে নিয়েছে।

ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের মূলে রয়েছে ইরাকের সাথে সেই দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা। সেই কঠিন সময়ে ইরান যখন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কবলে ধুঁকছিল, তখন সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল পুরো পশ্চিমাবিশ্ব। ইরানের শহরগুলোর ওপর তখন বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র পড়ত, আর বিশ্ববিবেক ছিল একদম পাথরের মতো নিশ্চুপ।

সেই সময় ইরানের কোনো কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই নীরবতা ইরানকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। তারা বুঝেছে, বিপদের সময় কেউ পাশে থাকে না। সেই প্রতিরক্ষা শূন্যতা থেকেই ইরানের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা আর কখনো অন্যের অস্ত্রের অপেক্ষায় বসে থাকবে না এবং স্বনির্ভর হবে।

উন্নত যুদ্ধবিমান কেনা বা বিমান বাহিনীকে আধুনিকায়ন করা ইরানের জন্য অসম্ভব ছিল। কারণ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং আকাশচুম্বী খরচ তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই ইরান বিকল্প হিসেবে দেশীয় প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের পথ বেছে নেয়। এটি ছিল একটি সাশ্রয়ী কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী কৌশল যা শত্রুকে ঘায়েল করতে সক্ষম।

ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির বেশ কিছু স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা রয়েছে। এটি রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ এবং বিদেশি যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা অনেক কম। এর মাধ্যমে ইরান এমন এক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যা শত্রুর মনে আতঙ্ক তৈরি করে। ১৯৬০-এর দশকের সেই অরক্ষিত অবস্থায় ফিরে যাওয়া ইরানের জন্য এখন কোনোভাবেই সম্ভব কিংবা কাম্য নয়।

ইরান এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে চারপাশ থেকে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি তাদের ঘিরে রেখেছে। পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের পশ্চিমা অস্ত্র কিনছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক সামরিক সক্ষমতা এই অঞ্চলে এক চরম ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। এমন অবস্থায় ইরান হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না।

সীমিত বাজেটের কারণে ইরান সমান্তরালভাবে অস্ত্র প্রতিযোগিতা করতে পারেনি। তাই তারা 'অপ্রতিসম প্রতিরোধ' বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, কম খরচে এমন প্রযুক্তি তৈরি করা যা শত্রুর বিশাল ব্যয়বহুল যুদ্ধজাহাজ বা বিমানকে নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আজ সেই কৌশলের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

ইরানের বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার—যদি আমাদের ওপর হামলা হয়, তবে তার জবাব হবে ভয়াবহ। তারা যুদ্ধ শুরু করতে চায় না, কিন্তু যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে চায়। এই ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির লক্ষ্য হলো শত্রুকে এটা বোঝানো যে, ইরানে হামলা করলে তার চড়া মূল্য দিতে হবে। এটিই মূলত তেহরানের সফল প্রতিরক্ষা দর্শনের মূল ভিত্তি।

তেহরানের দৃষ্টিতে, যখন তাদের চারপাশের হুমকিগুলো বহাল তবিয়তে আছে, তখন ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। একতরফাভাবে নিজের শক্তি কমানো মানে হলো শত্রুর হাতে নিজের গলা বাড়িয়ে দেওয়া। গভীর অবিশ্বাসের পরিবেশে নিরস্ত্রীকরণ কেবল বিপজ্জনক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করার সমান বলে তারা মনে করে।

ইরান বারবার বলছে যে তাদের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কেবল আত্মরক্ষার জন্য, কোনো ধ্বংসলীলার জন্য নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি স্বাধীন দেশের নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার রয়েছে। যেখানে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে হাজার হাজার পারমাণবিক বোমা রয়েছে, সেখানে ইরানের সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা কেন—এটি একটি বড় প্রশ্ন।

পশ্চিমা বিশ্বের এই দ্বিচারিতা ইরানকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। তারা মনে করে, প্রতিরক্ষা নিয়ে আপস করা মানে হলো জাতীয় মর্যাদা বিসর্জন দেওয়া। এটি কেবল সামরিক সক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এটি রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। ইরানের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হলো তাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা এবং স্বনির্ভরতার এক অনন্য প্রতীক।

পরমাণু চুক্তির তিক্ত অভিজ্ঞতা ইরানকে শিখিয়েছে যে, পশ্চিমাদের কথায় বিশ্বাস করা যায় না। ইরান পরমাণু চুক্তিতে অনেক ছাড় দিয়েছিল, কিন্তু আমেরিকা একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকতা প্রমাণ করেছে যে, শত্রুর মুখে হাসি থাকলেও তাদের অন্তরে রয়েছে কেবল বিষ ও ষড়যন্ত্র।

ইরানি নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, আজ যদি তারা ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা কমাতে রাজি হয়, তবে কাল দাবি উঠবে তাদের ড্রোন প্রযুক্তি বন্ধ করতে হবে। পরশু দাবি উঠবে তাদের আঞ্চলিক প্রভাব কমাতে হবে। এভাবে তারা ইরানকে একদম পঙ্গু করে দিতে চায়। তাই শুরুতেই 'রেড লাইন' টেনে দেওয়া ইরানের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাস্তবতা হলো, সামরিক শক্তি ছাড়া কূটনীতি কেবল একটি অন্তঃসারশূন্য শব্দ মাত্র। আলোচনার টেবিলে আপনার কথা তখনই শোনা হবে যখন আপনার পেছনে শক্তিশালী সামরিক ব্যাকআপ থাকবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি তাদের আন্তর্জাতিক দর কষাকষিতে এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে, যা আগে কখনো কোনো মুসলিম দেশের ছিল না।

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা অপরিহার্য। যদি আপনার বন্দর, শোধনাগার বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র শত্রুর লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে, তবে কোনো বিনিয়োগকারী আসবে না। ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাদের জাতীয় অবকাঠামোর জন্য একটি বিমা বা ইন্স্যুরেন্সের মতো কাজ করে। এটি কেবল যুদ্ধের অস্ত্র নয়, এটি স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি।

শেষে বলা যায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কেবল জেদ নয়, বরং এটি টিকে থাকার অনিবার্য যুক্তি। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, নিষেধাজ্ঞা এবং বিজাতীয় শক্তির আগ্রাসন তাদের এই পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। আজ ইরান বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারছে কারণ তাদের হাতে রয়েছে সেই শক্তি যা যেকোনো দাম্ভিক শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করে।

তেহরানের এই অদম্য যাত্রায় আমরা দেখতে পাই এক লড়াকু জাতির প্রতিচ্ছবি। তারা প্রমাণ করেছে যে, যদি লক্ষ্য থাকে অটুট এবং ইমান থাকে শক্ত, তবে কোনো অবরোধই উন্নয়নকে আটকাতে পারে না। ইনশাল্লাহ, ইরানের এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা আগামী দিনে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে এবং সাম্রাজ্যবাদের পতন ঘটাবে।

আজকের এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম কেন ইরান তার অবস্থানে অটল। সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না, আর ইরান সেই সত্যের পতাকা বহন করছে। পশ্চিমা অপপ্রচারের বিপরীতে ইরানের এই বীরত্বগাথা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নিজের শক্তিই হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তি। আমাদের সজাগ হতে হবে।

আজকের ভিডিওটি আপনাদের কেমন লেগেছে তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। আপনি কি মনে করেন ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ইসরায়েলের আগ্রাসন রুখতে সক্ষম? আপনার মতামত আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। 

news