পাপ ছাড়ে না বাপকে, আর অতি দর্পে হত লঙ্কা। আমেরিকা কি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে? ডোনাল্ড ট্রাম্প কি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিশ্বকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন? ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের চেয়েও বড় সামরিক প্রস্তুতির খবর পাওয়া যাচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ট্রাম্পের নিজের সহকারীরাই এখন তাকে বলছেন—"ইরান নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন, আগে নিজের চেয়ার বাঁচান!" আজ আমরা উন্মোচন করবো হোয়াইট হাউসের সেই গোপন নথিপত্র যা কাঁপিয়ে দিচ্ছে খোদ ওয়াশিংটনকে।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা দেখা দিচ্ছে, যার মূলে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুঁয়েমি। ইরানকে পদানত করতে তিনি যে বিশাল সৈন্য সমাবেশ করছেন, তা আধুনিক ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তেহরানের আকাশসীমায় যেকোনো মুহূর্তে গর্জে উঠতে পারে মার্কিন যুদ্ধবিমান। কিন্তু এই আস্ফালন কি কেবলই বীরত্ব নাকি নিজের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার এক শেষ চেষ্টা?

ট্রাম্পের লক্ষ্য পরিষ্কার—তিনি আয়াতুল্লা আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা বা 'রেজিম চেঞ্জ' করতে চান। ইরানের স্বাধীনচেতা মনোভাব দীর্ঘকাল ধরেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চোখের বালি হয়ে আছে। তবে এবার ট্রাম্পের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন তার নিজের দলের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারা মনে করছেন, খামেনির পতন ঘটানোর চেয়ে ট্রাম্পের নিজের ক্ষমতা রক্ষা করা এখন অনেক বেশি কঠিন এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ট্রাম্পের একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত তাকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। সম্প্রতি দেশটির আদালত ট্রাম্পের আরোপিত বৈশ্বিক শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করায় তিনি আইনগতভাবেও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, যা তার জন্য বড় এক ধাক্কা।

কেবল আদালত নয়, সাধারণ মার্কিনিদের জীবনযাত্রার মানের ক্রমাবনতি রিপাবলিকানদের জনপ্রিয়তা তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশচুম্বী দাম এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসন পুরোপুরি ব্যর্থ। মানুষ যখন ডাল-ভাতের চিন্তায় অস্থির, তখন ট্রাম্প ব্যস্ত কোটি কোটি ডলার খরচ করে ইরানের বিরুদ্ধে রণসজ্জা সাজাতে। এই বৈপরীত্য মার্কিনিদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে যা ব্যালটে প্রতিফলিত হবে।

ট্রাম্প নিজেও জানেন যে আসন্ন নির্বাচনে যদি তার দল হেরে যায়, তবে তিনি হয়ে পড়বেন 'মুকুটহীন রাজা'। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা হাউস বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলেই তাকে অভিশংসন বা ইমপিচ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে জনসভায় একাধিকবার এই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। নিজের জেল হওয়ার ভয় আর ক্ষমতা হারানোর আতঙ্ক তাকে দিনরাত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে।

রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। অথচ তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টারা বারবার তাকে সতর্ক করছেন। তারা বলছেন, সাধারণ ভোটারদের অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা দূর না করলে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে কোনো লাভ হবে না। সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার এই খেলা এবার বুমেরাং হতে পারে ট্রাম্পের জন্য।

ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিমাণ অস্ত্র ও সৈন্য পাঠাচ্ছেন, তা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সর্বোচ্চ। অথচ কেন এই যুদ্ধ প্রয়োজন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা তিনি জনগণের কাছে দিতে পারেননি। ইরানের বিরুদ্ধে এই অতি-নিবিষ্টতা আসলে তার অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে বিশ্ববাসীর নজর ঘোরানোর একটি কৌশল মাত্র। কিন্তু সচেতন মার্কিন নাগরিকরা এখন আর আগের মতো অন্ধভাবে যুদ্ধ সমর্থন করছে না।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিনির কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রধান অগ্রাধিকার। কিন্তু ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে কেবল যুদ্ধের পেছনে ছুটছে। হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকেই খবর আসছে যে, ইরানের ওপর সরাসরি হামলার বিষয়ে প্রশাসনের ভেতর কোনো একীভূত সমর্থন নেই। অনেকেই মনে করছেন, এই যুদ্ধ আমেরিকার জন্য এক বিশাল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা দোদুল্যমান ভোটারদের নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। কারণ মধ্যবিত্ত মার্কিনিরা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। এমন অবস্থায় ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু করলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দেবে। তাই উপদেষ্টারা ট্রাম্পকে বারবার যুদ্ধের পথ থেকে ফিরে আসার অনুরোধ করছেন।

সম্প্রতি এক ক্যাবিনেট ব্রিফিংয়েও একই সুর শোনা গেছে। সেখানে উপস্থিত না থাকলেও ট্রাম্পকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনের প্রধান প্রচার বিষয় হওয়া উচিত অর্থনীতি। কিন্তু ট্রাম্প যেন কোনো কথাই শুনতে চাচ্ছেন না। তিনি মনে করছেন, বিদেশের মাটিতে জয় ছিনিয়ে আনলে হয়তো দেশের মানুষ তার ব্যর্থতা ভুলে যাবে। অথচ ইতিহাস বলে, অন্যায্য যুদ্ধ কখনোই কোনো শাসককে বাঁচাতে পারেনি।

এদিকে হোয়াইট হাউসের কিছু অন্ধ সমর্থক 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির দোহাই দিয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী আচরণকে সমর্থন দিচ্ছে। তাদের মতে, বিশ্বকে নিরাপদ করতে হলে ইরানকে দমন করা জরুরি। কিন্তু এই তথাকথিত নিরাপত্তার নামে আমেরিকা আসলে সারা বিশ্বে অশান্তির বীজ বপন করছে। ইরানের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে সংঘাতে জড়ানো মানে হলো ইসরায়েলসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আগুনের কুণ্ডলীতে ফেলে দেওয়া।

রিপাবলিকান কৌশলী রব গডফ্রে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক বিপদ। ট্রাম্পের মূল সমর্থক গোষ্ঠী তাকে পছন্দ করেছিল কারণ তিনি 'চিরস্থায়ী যুদ্ধ' বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন যদি তিনি নিজেই সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নতুন যুদ্ধ শুরু করেন, তবে তার বিশ্বস্ত সমর্থকরাই তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে যা হবে চরম বিপর্যয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ইরান কোনো সাধারণ দেশ নয়। ভেনেজুয়েলার মতো দেশের ওপর মার্কিন খবরদারি চললেও ইরানের সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ের। ইরানের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের মোকাবিলা করা মার্কিন বাহিনীর জন্য নরক যন্ত্রণার মতো হবে। ইরানকে ছোট করে দেখার ভুলটিই হয়তো হবে আমেরিকার ইতিহাসের শেষ এবং সবচেয়ে বড় ভুল।

ট্রাম্প বারবার বলছেন যে তেহরানের সাথে একটি 'ন্যায্য চুক্তি' হওয়া দরকার। কিন্তু তার এই ন্যায্যতার সংজ্ঞা হলো ইরানের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়া। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার চেষ্টার পর তেহরান যে কড়া জবাব দিয়েছে, তাতেই বোঝা যায় তারা পিছু হটবে না। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আক্রান্ত হলে তারা এমন প্রতিশোধ নেবে যা আমেরিকা কল্পনাও করতে পারবে না।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পেছনে বড় কারণ ছিল মুদ্রাস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তিনি যুদ্ধের পেছনেই বেশি আগ্রহী। ভোটাররা দেখছেন যে তাদের করের টাকা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসলীলা চালানোর প্রস্তুতি চলছে, অথচ নিজের দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। এই অসন্তোষ ট্রাম্পকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই।

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো হবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির জন্য এক চূড়ান্ত পরাজয়। যদি ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তবে ট্রাম্পের কোনো বিলে অনুমোদন মিলবে না। তার প্রেসিডেন্সির শেষ বছরগুলো হবে কেবল তদন্ত আর শুনানির মোকাবিলা করা। এই রাজনৈতিক পঙ্গুত্ব এড়াতে ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছেন, যা তাকে আরও হঠকারী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যা বিশ্বশান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন আসলে ট্রাম্পের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি গণভোট। মানুষ যদি মুদ্রাস্ফীতি আর জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোট দেয়, তবে ট্রাম্পের পতন অনিবার্য। আর এই পতনের পর তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে তা হবে তার জন্য চরম অপমান। নিজের দম্ভ আর অহংকারের কারণে তিনি আজ নিজের দেশের মানুষের কাছেই এক বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।

শেষে বলা যায়, ট্রাম্প যদি মনে করেন ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে তিনি নিজের চেয়ার বাঁচাবেন, তবে তিনি ভুল স্বর্গে বাস করছেন। ইরান একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি যারা সাম্রাজ্যবাদের সামনে মাথা নত করতে শেখেনি। বরং এই যুদ্ধ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ ফাটলগুলোকে আরও স্পষ্ট করে দেবে। ট্রাম্পের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, আর তার এই পতনের ইতিহাস লেখা হবে তারই ভুল সিদ্ধান্তের কালিতে।

দর্শক, আপনি কি মনে করেন ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব কি তাকে আগামী নির্বাচনে রক্ষা করতে পারবে? নাকি ইরানই হবে আমেরিকার পতনের মূল কারণ? আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের কমেন্ট বক্সে জানান।

news