চুন খেয়ে গাল পোড়ে যার, দই দেখলে ভয় পায় সে। আর মশা মারতে কামান দাগা নয়, ড্রোন দিয়েই কেল্লাফতে করছে ইরান। ২০১১ সালে যখন আমেরিকা তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী স্টিলথ ড্রোন 'আরকিউ-১৭০' (RQ-170) ইরানের আকাশে পাঠিয়েছিল, তারা ভেবেছিল ইরান একে শনাক্তও করতে পারবে না। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ইরান কেবল একে শনাক্তই করেনি, বরং ড্রোনটিকে হ্যাক করে অক্ষত অবস্থায় নিজেদের মাটিতে নামিয়ে এনেছিল! আজ সেই ইরান ড্রোনের জগতে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, খোদ আমেরিকার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের সামনে অসহায়। কীভাবে একটি দেশ কয়েক দশকের অবরোধের মাঝেও বিশ্বের এক নম্বর ড্রোন শক্তি হয়ে উঠল? আজ আমরা ফাঁস করবো ইরানের সেই গোপন প্রযুক্তির রহস্য।

ইরানের ড্রোন বা ইউএভি (UAV) কর্মসূচি আজ কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের সমরবিদদের জন্য গবেষণার বিষয়। যখন পশ্চিমা বিশ্ব ইরানকে স্রেফ একটি পিছিয়ে পড়া দেশ হিসেবে প্রচার করত, তখন তেহরান অত্যন্ত নীরবে তাদের ড্রোন বাহিনীকে শক্তিশালী করে যাচ্ছিল। আজ ইরানের ড্রোনের চাহিদা রাশিয়া থেকে শুরু করে আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এটি কেবল একটি অস্ত্র নয়, এটি ইরানের মেধা এবং অদম্য জেদের প্রতিফলন।

ইরানি ড্রোনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর 'কস্ট-ইফেক্টিভনেস' বা সাশ্রয়ী মূল্য। আমেরিকার একটি ড্রোন তৈরি করতে যেখানে লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ হয়, ইরান সেখানে মাত্র কয়েক হাজার ডলারে বিধ্বংসী 'শাহেদ' ড্রোন তৈরি করছে। যখন শত শত ড্রোন একসাথে ঝাঁকে ঝাঁকে বা 'ড্রোন সোয়ার্ম' হিসেবে আক্রমণ করে, তখন আমেরিকার কোটি কোটি ডলারের ডিফেন্স সিস্টেমগুলোও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এটিই ইরানের আসল শক্তি।

'শাহেদ-১৩৬' বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে আলোচিত ড্রোন। একে বলা হয় 'কামিকাজে' বা আত্মঘাতী ড্রোন। এটি যখন লক্ষ্যবস্তুর দিকে যায়, তখন এর ইঞ্জিনের শব্দ শত্রুর মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এই ড্রোনগুলো রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধে এই ড্রোনের সাফল্য দেখে পশ্চিমা দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি কতটা উন্নত।

ইরানের ড্রোনের যাত্রা শুরু হয়েছিল আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। তখন ইরান খুব সাধারণ কিছু ড্রোন দিয়ে শত্রু পক্ষকে পর্যবেক্ষণ করত। কিন্তু আজ তাদের হাতে আছে 'গাজা', 'মোহাজের-১০' এবং 'শাহিদ-১৪৯'-এর মতো ড্রোন, যা টানা ২৪ ঘণ্টার বেশি আকাশে উড়তে পারে এবং কয়েকশ কেজি ওজনের মিসাইল বহন করতে পারে। এটি ইরানের প্রকৌশলীদের এক অভাবনীয় সাফল্য যা ট্রাম্পের আস্ফালনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।

আমেরিকা এবং ইসরায়েল সব সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দেয়। কিন্তু তারা জানে, হামলার পর ইরান তাদের হাজার হাজার ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি জ্বালিয়ে দেবে। ইরানের এই ড্রোন বাহিনী মূলত একটি 'প্রতিরোধমূলক দেয়াল' হিসেবে কাজ করছে। আজ ইরানকে আক্রমণ করার আগে পেন্টাগন দশবার ভাবে, কারণ তারা জানে ইরানের ড্রোনগুলো তাদের তেলবাহী জাহাজ থেকে শুরু করে সামরিক ঘাঁটি—সবকিছু গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো তাদের 'রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং' সক্ষমতা। আমেরিকা যতবার তাদের ড্রোন ইরানের হাতে হারিয়েছে, ইরান ততবারই সেগুলো খুলে প্রতিটি যন্ত্রাংশ বিশ্লেষণ করে নিজেদের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করেছে। আজ ইরানের অনেক ড্রোন মার্কিন ড্রোনের চেয়েও বেশি কার্যকর এবং টেকসই। এটি আমেরিকার সামরিক অহংকারের মুখে এক বড় চপেটাঘাত যা তাদের প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ফুটিয়ে তুলেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ইরানের বিরুদ্ধে 'সর্বোচ্চ চাপ' প্রয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু ইরান সেই চাপকে সুযোগে পরিণত করেছে। আজ ইরান ড্রোনের ইঞ্জিন থেকে শুরু করে গাইডেন্স সিস্টেম—সবকিছু নিজেদের দেশেই তৈরি করছে। তারা কোনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল নয়। এই স্বনির্ভরতাই ইরানকে বর্তমান বিশ্বের এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছে। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা আসলে ইরানের উদ্ভাবনী শক্তিকেই উস্কে দিয়েছে।

ইরানের ড্রোনের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধরন চিরতরে বদলে গেছে। ইয়েমেনের হুথিরা যখন ইরানি প্রযুক্তির ড্রোন দিয়ে সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছিল, তখন সারা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল যে আমেরিকার দেওয়া পেট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এটিই হলো ইরানের শক্তির আসল নমুনা। ড্রোন আজ একটি ছোট দেশের হাতেও পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার সামর্থ্য এনে দিয়েছে।

ইরানের গোয়েন্দা ড্রোনগুলো নিয়মিত পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরীগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে যায় এবং অত্যন্ত উচ্চমানের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে। মার্কিন নৌবাহিনী সেগুলো দেখেও কিছু করতে পারে না, কারণ আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় ওড়া এই ড্রোনগুলোকে গুলি করা মানেই যুদ্ধের আমন্ত্রণ। ইরান এভাবে প্রতিনিয়ত আমেরিকাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন আর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে নেই।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ইরানের ড্রোনের ভিডিওগুলো যখন ভাইরাল হয়, তখন পশ্চিমাদের দম্ভ ধুলোয় মিশে যায়। ইরান কেবল যুদ্ধ ড্রোন নয়, বরং কৃষি এবং উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্যও উন্নত ড্রোন তৈরি করছে। তবে তাদের সামরিক ড্রোনগুলোই আজ বিশ্ব রাজনীতির মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান আজ প্রমাণ করেছে যে, ইমানি শক্তি এবং বিজ্ঞানের সমন্বয় থাকলে যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়।

আমেরিকা ও ইসরায়েল এখন মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে কীভাবে ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির প্রসার থামানো যায়। তারা বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে যাতে কেউ ইরানি ড্রোন না কেনে। কিন্তু সত্যি হলো, কম দামে এত উন্নত প্রযুক্তি কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। ইরানের ড্রোন আজ একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে যা বিশ্ববাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে এবং আমেরিকার একচেটিয়া ড্রোন ব্যবসার অবসান ঘটাচ্ছে।

ইরানের 'গাজা' ড্রোনটি তাদের ড্রোন শিল্পের মুকুটে এক নতুন পালক। এটি একসাথে ১৩টি বোমা বহন করতে পারে এবং এর পাল্লা ২,০০০ কিলোমিটারের বেশি। এর মানে হলো এটি ইরান থেকে উড়ে গিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের একাংশেও অপারেশন চালাতে পারে। ট্রাম্প এবং তার উত্তরসূরিরা এই সক্ষমতার কথা ভেবেই মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছেন।

ভবিষ্যতের যুদ্ধে ড্রোনই হবে প্রধান চালিকাশক্তি। আর ইরান সেই যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তারা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে ড্রোন পরিচালনার কাজ শুরু করেছে। একসময় ড্রোন পরিচালনা করতে মানুষের প্রয়োজন হতো, কিন্তু ইরানের নতুন ড্রোনগুলো নিজেরাই লক্ষ্যবস্তু চিনে আক্রমণ করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ইরানকে অজেয় করে তুলেছে যা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য চরম দুঃসংবাদ।

শেষে বলা যায়, ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি কেবল যুদ্ধের সরঞ্জাম নয়, এটি একটি স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। যারা ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, আজ তারা ইরানের ড্রোনের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আস্ফালন আর ইসরায়েলের ষড়যন্ত্রের মুখে ইরানের এই ড্রোন বাহিনী হলো এক দুর্ভেদ্য ঢাল। ইরান আজ বিশ্বের ড্রোন পরাশক্তি—এটি আর কোনো জল্পনা নয়, এটি এক কঠিন বাস্তবতা।

দর্শক, আপনি কি মনে করেন ইরানের এই ড্রোন শক্তি কি সত্যিই আমেরিকার নৌ-আধিপত্যের অবসান ঘটাবে? নাকি ড্রোন যুদ্ধই হবে ভবিষ্যতের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান রূপ? আপনার মতামত আমাদের কমেন্ট বক্সে জানান। 

news