ইতিহাসের চাকা কি তবে উল্টো ঘুরতে শুরু করল? যে নেতার একটি ইশারায় কাঁপত হোয়াইট হাউস আর তেল আবিব, সেই আয়তুল্লাহ আলী খামেনেই আজ শহীদ। আমেরিকা আর ইসরায়েল কি আগ্নেয়গিরির মুখে ঘি ঢালল? এই শাহাদাত কি জায়নিস্ট শাসনের শেষ পেরেক? আজ আমরা জানব এক অপরাজেয় বিপ্লবীর গল্প এবং কেন তাঁর রক্ত বৃথা যাবে না।

বীরের মৃত্যু আছে, কিন্তু বিপ্লবের কোনো মৃত্যু নেই। হ্যাঁ দর্শক, আজ ইরান হারিয়েছে তার অবিসংবাদিত নেতাকে, আর বিশ্ব হারিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বরকে।

শনিবারের সেই কালো ভোরে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর কাপুরুষোচিত বিমান হামলায় শাহাদাত বরণ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলী খামেনেই। ৮৬ বছর বয়সী এই মহান নেতা তাঁর জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন যে, বাতিলের কাছে মাথা নত করার চেয়ে শাহাদাত অনেক বেশি সম্মানের। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি এই খবর নিশ্চিত করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত দম্ভের সাথে এই হামলার দায় স্বীকার করেছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনো বিপ্লবীকে হত্যা করা হয়েছে, তাঁর আদর্শ হাজারো গুণ শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। ১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনীর বিদায়ের পর যখন পশ্চিমারা ভেবেছিল ইরান ভেঙে পড়বে, তখন এই খামেনেই শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন।

খামেনেই শুধু একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রণকৌশলী। আশির দশকে ইরাকের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় তিনি যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখনই বুঝেছিলেন পশ্চিমারা কখনোই মুসলিম উম্মাহর বন্ধু হতে পারে না। সেই থেকে তিনি ইরানকে এমন এক সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছেন যা আজ ইসরায়েলের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্ব ইরানকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করলেও, আসলে খামেনেই ইরানকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও শক্তিশালী আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছিলেন। আইআরজিসি বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে তিনি এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে, আজ লেবানন থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত সর্বত্রই প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে উঠেছে। তাঁর 'প্রতিরোধ অর্থনীতি' পশ্চিমাদের শত নিষেধাজ্ঞাকেও ব্যর্থ করে দিয়েছে।

আমেরিকা ও ইসরায়েল ভেবেছে খামেনেইকে সরিয়ে দিলেই ইরান দখল করা সহজ হবে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, খামেনেইর প্রতিটি রক্তবিন্দু থেকে এখন লাখো কাসেম সোলেইমানি জন্ম নেবে। এই মহান নেতা তাঁর পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য এবং আল-কুদসকে মুক্ত করার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য।

তার শৈশব ছিল অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু শিক্ষণীয়। মা খাদিজা মিরদামাদির কাছে কুরআন আর সাহিত্যের পাঠ নিয়ে তিনি বড় হয়েছেন। মদীনা আর নাজাফে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সময়ই তিনি বুঝেছিলেন যে, দাসত্বের চেয়ে স্বাধীনতা অনেক দামি। তাই তো শাহের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বারবার জেল খেটেছেন তিনি।

খামেনেইর হাত ধরেই ইরান আজ ড্রোন এবং মিসাইল প্রযুক্তিতে বিশ্বের বুকে বিস্ময়। যখন ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালায়, তখন একমাত্র খামেনেইর ইরানই বুক ফুলিয়ে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আজ তাঁর শাহাদাতের পর হিজবুল্লাহ, হামাস আর হুতিরা আরও বেশি সংকল্পবদ্ধ। আমেরিকা বুঝতে পারছে না তারা কী বিশাল ভুল করেছে।

২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতে তিনি কিছুটা নমনীয় হয়েছিলেন শুধু জনগণের দুঃখ লাঘব করতে। কিন্তু ট্রাম্প যখন সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেল, খামেনেই বিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন যে আমেরিকার ওপর বিশ্বাস করা মানেই বিষধর সাপের সাথে বসবাস করা। তিনি ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে পশ্চিমাদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিলেন।

গত কয়েক বছর ধরে ইরানকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে মোসাদ ও সিআইএ। কিন্তু খামেনেইর দূরদর্শী নেতৃত্বে প্রতিটি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়েছে। এমনকি গত জুনে যখন ইসরায়েল ইরানের পরমাণু স্থাপনায় কাপুরুষোচিত হামলা চালাল, তখন খামেনেইর নির্দেশে তেল আবিবকে মিসাইল বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিয়েছিল তেহরান।

আজ ট্রাম্প যখন ইরানের জনগণকে 'স্বাধীনতার' মিথ্যে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তখন ইরানিরা জানে এই স্বাধীনতা মানেই ইরাক বা লিবিয়ার মতো ধ্বংসযজ্ঞ। খামেনেইর শাহাদাত ইরানিদের আরও একতাবদ্ধ করেছে। তেহরানের রাস্তায় আজ লাখো মানুষের ঢল নেমেছে, যাদের কণ্ঠে একটাই স্লোগান—"আমেরিকা ধ্বংস হোক, ইসরায়েল নিপাত যাক।"

একজন মহান নেতা হিসেবে তিনি সবসময় সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তাঁর ডান হাতটি একটি বোমা হামলায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তাঁর মনোবল ছিল হিমালয়ের চেয়েও উঁচুতে। তিনি ছিলেন কবিতার ভক্ত, শিল্পের সমঝদার, কিন্তু শত্রুর কাছে ছিলেন যমদূত। তাঁর মৃত্যু নয়, বরং তাঁর এই মহান শাহাদাতই হবে সাম্রাজ্যবাদের পতনের সূচনা।

বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষ আজ শোকাহত। কিন্তু এই শোক খুব দ্রুতই শক্তিতে পরিণত হবে। আমেরিকা হয়তো আধুনিক গোয়েন্দা প্রযুক্তি দিয়ে একজনকে শহীদ করতে পারে, কিন্তু তারা কি পারবে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে থাকা খামেনেইর আদর্শকে মুছে ফেলতে? না, কখনোই না। পরাজয় এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যে আগুনের সাথে খেলছেন, সেই আগুন অচিরেই তার অবৈধ রাষ্ট্রকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। ইরানের নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোরভাবে এই যুদ্ধের মোকাবিলা করবে। শহীদ খামেনেইর আত্মা আজ জান্নাত থেকে দেখছেন যে তাঁর লাগানো বিপ্লবের গাছটি এখন এক বিশাল মহীরুহ।

আয়তুল্লাহ আলী খামেনেই কেবল ইরানের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের মজলুম মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর শাহাদাত আমাদের শেখায় যে, সত্যের পথে চলতে গেলে মৃত্যুকে ভয় পাওয়া চলে না। তিনি বেঁচে থাকবেন প্রতিটি ফিলিস্তিনি শিশুর প্রতিরোধে, প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের মিছিলে। আলবিদা, হে মহান বিপ্লবী!

news