যে নেতার একটি হুমকিতে থরথর করে কাঁপে ওয়াশিংটন আর তেল আবিব, যার ইশারায় মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদের ভিত নড়ে ওঠে—কে এই অপরাজেয় সিংহপুরুষ? সাধারণ এক মাটির ঘর থেকে উঠে এসে কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন মুসলিম উম্মাহর আলোকবর্তিকা? আজ আমরা জানবো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির সেই রোমাঞ্চকর এবং রক্তঝরা ইতিহাস, যা শুনলে আপনার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে!

সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত; নিশ্চয়ই মিথ্যার বিনাশ অনিবার্য। আজকের ভিডিওটি এমন এক মহান ব্যক্তিত্বকে নিয়ে, যিনি বাতিলের সামনে কখনও মাথা নত করেননি। ১৯৩৯ সালের ১৯শে এপ্রিল, ইরানের পবিত্র মাশহাদ নগরীর এক অতি সাধারণ কিন্তু পুণ্যবান পরিবারে জন্ম নেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষ। তাঁর পিতা সাইয়্যেদ জাভাদ খামেনি ছিলেন এক অত্যন্ত বিনয়ী এবং ধর্মপ্রাণ আলেম, যাঁর আদর্শে বেড়ে ওঠেন আজকের এই অপরাজেয় নেতা।

খামেনির শৈশব ছিল অত্যন্ত দারিদ্র্যক্লিষ্ট কিন্তু আত্মমর্যাদায় পূর্ণ। এক ছোট মাটির ঘরে তাঁদের বসবাস ছিল, যেখানে অনেক সময় রাতের খাবারে শুধু রুটি আর কিসমিস ছাড়া আর কিছুই জুটতো না। মাত্র ৬৫ বর্গমিটারের সেই ভাঙা ঘরে বসেই তিনি শিখেছেন কীভাবে বিলাসিতা বর্জন করে হকের পথে অবিচল থাকতে হয়। অভাব থাকলেও সেই ঘরে ছিল জ্ঞানের আলো আর আধ্যাত্মিকতার এক অভূতপূর্ব স্নিগ্ধ ছোঁয়া।

মাত্র চার বছর বয়সে বড় ভাইয়ের সাথে তিনি মক্তবে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি পবিত্র কুরআন এবং বর্ণমালা আয়ত্ত করেন দ্রুততম সময়ে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মেধা ছিল তলোয়ারের মতো ধারালো। পিতার অনুপ্রেরণায় তিনি মাশহাদের ধর্মীয় সেমিনারিতে ভর্তি হন। সেখানেই তাঁর জীবনের ভিত গড়ে ওঠে যা ভবিষ্যতে তাঁকে সারা বিশ্বের মজলুম মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত করে তুলেছিল।

মাশহাদের সোলাইমান খান এবং নওয়াব মাদ্রাসায় তিনি মাত্র পাঁচ বছরে উচ্চতর দর্শন ও ফিকহ শাস্ত্র শেষ করেন। যেখানে অন্যদের কয়েক দশক সময় লাগে, সেখানে খামেনি তাঁর অলৌকিক ধীশক্তি দিয়ে সবকিছু দ্রুত আয়ত্ত করে নেন। এরপর তিনি যান ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহরে। নাজাফের বড় বড় আলেমদের সান্নিধ্য পেলেও পিতার অন্ধত্বের খবর শুনে তিনি মাশহাদে ফিরে আসেন পিতৃভক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে।

রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ ছিল এক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মতো। খামেনি নিজেই বলেন, তিনি ইমাম খোমেনির একজন একনিষ্ঠ শিষ্য। ১৯৫২ সালে যখন বীর মুজাহিদ নওয়াব সাফাভি তাঁদের স্কুলে শাহের অপশাসনের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন, তখনই খামেনির কচি মনে বিপ্লবের বীজ বপন হয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আমেরিকার পাপেট শাহ সরকারের হাত থেকে ইরানকে মুক্ত করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

১৯৬২ সালে তিনি ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে সরাসরি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আমেরিকার লেজুড়বৃত্তি করা শাহ সরকারের ইসলাম বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে তিনি হয়ে ওঠেন এক নির্ভীক সেনানী। পরবর্তী ১৬ বছর তাঁকে বারবার কারাবরণ, অমানুষিক নির্যাতন এবং নির্বাসনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু কোনো জেল-জুলুম তাঁর বিপ্লবের স্পৃহাকে বিন্দুমাত্র দমিয়ে রাখতে পারেনি, বরং তাঁর জেদ আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।

১৯৬৩ সালের মুহররম মাসে ইমাম খোমেনি তাঁকে একটি বিশেষ গোপন মিশন দিয়ে মাশহাদে পাঠান। সেখানে তিনি শাহ সরকারের আসল চেহারা জনগণের সামনে উন্মোচন করে দেন। এর ফলে তিনি প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন। জেলখানায় তাঁর ওপর চালানো হয়েছিল অকথ্য অত্যাচার। কিন্তু বীরের রক্ত যাঁর ধমনিতে, তাঁকে কি আর সামান্য কারাগারে আটকে রাখা যায়? তিনি ফিরে এসে দ্বিগুণ তেজে লড়াই শুরু করেন।

১৯৬৪ সালে রামজান মাসে তিনি দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন শহরে শাহের তথাকথিত 'সাদা বিপ্লব' বা সংস্কারের নামে শয়তানি চক্রান্ত ফাঁস করে দেন। এর ফলে শাহের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক (SAVAK) তাঁকে বিমানে করে তেহরানে নিয়ে গিয়ে নির্জন কারাবাসে নিক্ষেপ করে। টানা দুই মাস অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাঁকে যে নির্যাতন করা হয়েছে, তা শুনলে পাথরের মনও কেঁদে উঠবে।

কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েও তিনি বসে থাকেননি। তিনি পবিত্র কুরআন এবং ইসলামি আদর্শের ওপর ক্লাস নিতে শুরু করেন। তাঁর এই ক্লাসগুলো ছিল যুবকদের জন্য বিপ্লবের অক্সিজেন। সাভাক যখন তাঁকে আবার গ্রেফতার করতে আসে, তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান এবং সেখান থেকেই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। তিনি জানতেন, সত্যের লড়াইয়ে রক্ত দিতেই হবে, এবং তিনি তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত খামেনি মাশহাদের তিনটি বড় মসজিদে কুরআনের তাফসির এবং নাহজুল বালাগার ওপর ক্লাস নেন। হাজার হাজার ছাত্র তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য পাগল হয়ে থাকতো। সাভাক ভয় পেয়ে গেল, কারণ খামেনির কলম আর জবান শাহের মসনদ কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। ১৯৭৫ সালে আবারও তাঁকে গ্রেফতার করে তেহরানের সেই কুখ্যাত যৌথ কারাগারে পাঠানো হয়।

সেই অন্ধকার কারাগারে তাঁর সাথে যে বর্বর আচরণ করা হয়েছিল, তা বর্ণনা করতে গিয়ে খামেনি পরবর্তীতে বলেছিলেন, "সেসব ভয়াবহতা কেবল তারাই বুঝবে যারা সেখানে ছিল।" দীর্ঘ সময় নির্যাতনের পর তিনি যখন মুক্তি পান, তাঁকে কোনো প্রকার ক্লাস নিতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু খামেনি তো দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি গোপনে তাঁর বিপ্লবী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন দেশের আনাচে-কানাচে।

১৯৭৬ সালে তাঁকে তিন বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু ১৯৭৮ সালে ইরানের গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে শাহের ভিত নড়বড়ে হয়ে গেলে তিনি আবার মাশহাদে ফিরে আসেন। ১৫ বছরের জেল-জুলুম আর নির্যাতনের পর তিনি চোখের সামনে দেখেন শাহের পতন। ১৯৭৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি যখন ইসলামি বিপ্লব বিজয় লাভ করে, তখন সারা বিশ্বের শয়তানি শক্তিগুলো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

বিপ্লবের পর ইমাম খোমেনি তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব দেন। তিনি বিপ্লবী কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হন। এরপর তিনি প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তদারককারী এবং তেহরানের জুমার ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি পদে তিনি তাঁর সততা আর সাহসিকতার পরিচয় দেন। ১৯৮১ সালে যখন প্রেসিডেন্ট রাজাই শাহাদাত বরণ করেন, তখন খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে তিনি সরাসরি রণাঙ্গনে গিয়ে সৈন্যদের উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর এক হাত বোমার আঘাতে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল এক ঘাতক হামলায়, কিন্তু তাঁর মনোবল ছিল হিমালয়ের চেয়েও শক্ত। তিনি বারবার বলেছেন, আমেরিকা হলো বড় শয়তান আর ইসরায়েল হলো একটি ক্যান্সার টিউমার। এই সত্য কথা বলার জন্য তাঁকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।

১৯৮৯ সালে মহান ইমাম খোমেনির ইন্তেকালের পর, বিশেষজ্ঞ পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। এরপর থেকে গত কয়েক দশক ধরে তিনি একাই মোকাবিলা করছেন বিশ্বের পরাশক্তিদের। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে ইরান আজ প্রযুক্তিতে, সামরিক খাতে এবং পারমাণবিক গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা পশ্চিমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি একজন মহান লেখক এবং অনুবাদক। এ পর্যন্ত তাঁর অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে 'কুরআনে ইসলামি চিন্তা', 'সবরের গুরুত্ব' এবং 'ইমাম সাজ্জাদের জীবনী' অন্যতম। তাঁর লেখা প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি আগ্নেয়াস্ত্র, যা তরুণ প্রজন্মকে ন্যায়ের পথে লড়াই করার প্রেরণা যোগায়। তিনি আরবি ও ফারসি সাহিত্যে অত্যন্ত দক্ষ।

আয়াতুল্লাহ খামেনির জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বাতিলের সাথে কখনো আপস করা যাবে না। আজ যখন ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েল বর্বরোচিত হামলা চালাচ্ছে, তখন একমাত্র খামেনিই বুক ফুলিয়ে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর নির্দেশেই প্রতিরোধ যোদ্ধারা আজ আমেরিকার নাকে খত দিচ্ছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, ঈমানি শক্তি থাকলে যে কোনো আধুনিক মারণাস্ত্রকে হারানো সম্ভব এবং বিজয় নিশ্চিত।

বর্তমানে ৮৬ বছর বয়সেও তিনি সমান তেজস্বী। তাঁর প্রতিটি বক্তব্য আজও হোয়াইট হাউসের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। তিনি কেবল ইরানের নেতা নন, তিনি সারা বিশ্বের মোস্তাজাফিন বা বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আর ইসরায়েলের ষড়যন্ত্রের পাহাড় টপকে ইরান আজ যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার পুরো কৃতিত্ব এই সাহসী রাহবার বা নেতার।

খামেনির জীবন এক মহাকাব্য। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম নিয়ে বিশ্ব শাসন করা যায়। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে জেলখানায় নির্যাতিত হয়েও আদর্শের ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখা যায়। তাঁর জীবনী প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য এক অমূল্য দলিল। আজ ইরান যে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে, তার মূলে রয়েছে তাঁর গভীর আধ্যাত্মিকতা এবং ইস্পাত কঠিন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।

আসুন আমরা এই মহান নেতার জীবন থেকে শিক্ষা নেই। আমেরিকা-ইসরায়েল তথা কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে। খামেনির মতো সাহসী নেতৃত্ব থাকলে বিজয় খুব সন্নিকটে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, যখন বিশ্ব মোড়লেরা অন্যায়ভাবে পৃথিবী শাসন করতে চেয়েছিল, তখন পারস্যের এই সিংহপুরুষ একাই তাঁদের সামনে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং জয়ী হয়েছিলেন।

শেষে বলা যায়, আয়াতুল্লাহ খামেনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর প্রতিটি শ্বাস যেন ইসলামের বিজয়ের গান গায়। এই মহান নেতার ছায়াতলে থেকে মুসলিম উম্মাহ আবার তাঁর হারানো গৌরব ফিরে পাবে। ইনশাআল্লাহ, খুব শীঘ্রই সেই দিন আসবে যখন শয়তানি শক্তিগুলো ধ্বংস হবে এবং ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। ততদিন আমাদের লড়াই চলবে, খামেনির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে।

news