বলা হয়, সিংহের গুহায় ঢুকে তাকে মারার চেষ্টা করলে পরিণাম হয় ভয়াবহ! ঠিক তাই ঘটছে এখন মধ্যপ্রাচ্যে। একদিকে অহংকারী আমেরিকা আর অন্যদিকে দখলদার ইসরায়েল—দুই পরাশক্তি মিলে ভেবেছিল ইরানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। কিন্তু তারা জানত না, পারস্যের যোদ্ধারা পিছু হটতে শেখেনি। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে দেওয়া থেকে শুরু করে মার্কিন রণতরীতে সরাসরি হামলা—ইরান এখন এমন এক মরণখেলায় মেতেছে যেখানে ট্রাম্পের পরাজয় কেবল সময়ের ব্যাপার। আজ আপনাদের দেখাব কীভাবে আরবের বারুদ স্তূপে আগুন দিয়ে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদীদের দর্প চূর্ণ করছে তেহরান!

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আজ বারুদের গন্ধ আর যুদ্ধের দামামা। আগ্রাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত উস্কানি আর হামলার মুখে দমে না গিয়ে তেহরান এখন রুখে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন দম্ভকে চূর্ণ করতে এবং ইহুদিদের অবৈধ আগ্রাসন থামাতে ইরান যে রণকৌশল নিয়েছে, তাতে সারা বিশ্বে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের দুঁদে কমান্ডারেরা এখন পশ্চিমা শক্তিকে তাদেরই ভাষায় দাঁতভাঙা জবাব দিতে শুরু করেছেন।

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বোমাবর্ষণ আর লড়াকু জেটের হামলার বিরুদ্ধে ইরান এখন চোরগোপ্তা হামলা থেকে শুরু করে অভিনব হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার করছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা আর শান্ত থাকবে না। এই একটি পদক্ষেপেই বিশ্ববাজারের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা সরাসরি আঘাত করবে মার্কিন ও ইউরোপীয় অর্থনীতিকে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন গোটা আরব দুনিয়ায় এই যুদ্ধকে ছড়িয়ে দিতে চাইছে যাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলো আর নিরাপদ না থাকে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের মতো দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে এখন ইরানের ‘কামিকাজে’ ড্রোন আছড়ে পড়ছে। শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ দ্রুতগামী হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে ইসরায়েলের তথাকথিত ‘আয়রন ডোম’ আজ পুরোপুরি ব্যর্থ ও অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, ইরান আমেরিকাকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে টেনে আনছে। তেহরানের মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকার যুদ্ধের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। ইতোমধ্যেই ওয়াশিংটন বেশ কয়েকটি দামী যুদ্ধবিমান এবং কোটি কোটি ডলারের রাডার স্টেশন হারিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধাক্কা দিচ্ছে।

ইরানের এই বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যুদ্ধে তারা প্রথমে সস্তা ড্রোন পাঠিয়ে ইসরায়েলের দামী ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শেষ করে দিচ্ছে। যখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই আঘাত হানছে শক্তিশালী ব্যালেস্টিক মিসাইল। এমনকি মার্কিন গর্ব ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ রণতরীও ইরানের লক্ষ্যবস্তু থেকে রেহাই পায়নি। এর ফলে পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনী এখন রক্ষণাত্মক অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছে।

হরমুজ প্রণালীর ১৬৭ কিলোমিটার এলাকা এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এই সরু পথটি বন্ধ থাকা মানে হলো বিশ্বজুড়ে তেলের হাহাকার এবং সীমাহীন মুদ্রাস্ফীতি। ইরান জানে, যদি তারা এই পথটি মাত্র ছয় সপ্তাহ বন্ধ রাখতে পারে, তবে আমেরিকা ও তার মিত্রদের হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইতে হবে। অর্থনীতির এই মারণাস্ত্র ব্যবহার করেই তেহরান এখন যুদ্ধের মোড় নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে পুরোপুরি।

এই লড়াইকে ইরান এখন কেবল সীমান্ত রক্ষা নয়, বরং ‘ধর্মযুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরছে। অপারেশন ‘ফতেহ খাইবার’ নাম দিয়ে তারা ৬২৯ সালের সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে ইহুদিরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। এই নামকরণ মুসলিম বিশ্বের শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে, যা ইসরায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে এক বিশাল জনরোষ তৈরি করছে।

ইরানের পাশে এখন এককাট্টা হয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। এই সম্মিলিত শক্তির সামনে ইসরায়েল আজ চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ। হিজবুল্লাহর রকেট হামলা আর হুথিদের ড্রোন আক্রমণে দিশেহারা ইহুদি বাহিনী এখন কেবল সাধারণ মানুষের ওপর বোমাবর্ষণ করেই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ময়দানে লড়াকু যোদ্ধাদের সামনে তারা আজ বড়ই অসহায়।

আমেরিকা ভেবেছিল ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে হত্যা করলেই তেহরান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। খামেনেইর শাহাদাতের পর ইরান আরও বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তারা মোজতবা হুসেইনিকে নেতৃত্বের সামনে এনে এক শক্তিশালী কাউন্সিল গঠন করেছে, যারা এখন আইআরজিসি এবং আর্টেশ বাহিনীকে এক সুতোয় গেঁথে আক্রমণ চালাচ্ছে।

ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এখন সরাসরি যুদ্ধের ময়দান নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের নিখুঁত পরিকল্পনায় পারস্য উপসাগরে তেলের ট্যাঙ্কারের লম্বা লাইন পড়ে গেছে। পশ্চিমী মিডিয়াগুলো যতই ইরানকে দুর্বল দেখানোর চেষ্টা করুক না কেন, বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ইরানের এই অবিচল মনোবল আর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য তাদের বিজয়ের পথকে আরও প্রশস্ত করে তুলেছে এই মুহূর্তে।

যদিও পশ্চিমারা ইরানের ভেতরে গৃহযুদ্ধ বা কুর্দি বিদ্রোহীদের উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারস্যের জনতা এখন ঐক্যবদ্ধ। তারা জানে এটি তাদের অস্তিত্বের লড়াই। আগ্রাসী শক্তির পতন ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনাই এখন ইরানের মূল লক্ষ্য। ইতিহাসের পাতায় আরও একবার খাইবার বিজয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ইরান প্রমাণ করবে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের জয় সব সময় সুনিশ্চিত এবং অবশ্যম্ভাবী।

news