ঢাকা, মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০২৬ | ১২ ফাল্গুন ১৪৩২
Logo
logo

ইরানের সামনে ট্রাম্পের দোদুল্যমান সিংহাসন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের দামামা কি আমেরিকার পতন আর তেহরানের ঐতিহাসিক উত্থান ডেকে আনছে


আনন্দ খবর ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৩:০২ এএম

ইরানের সামনে ট্রাম্পের দোদুল্যমান সিংহাসন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের দামামা কি আমেরিকার পতন আর তেহরানের ঐতিহাসিক উত্থান ডেকে আনছে

অহংকার পতনের মূল— ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যে শক্তি অন্যকে দমাতে চায়, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই নিজের ভারে নুয়ে পড়ে। আজকের আলোচনায় আমরা এমন এক উত্তপ্ত বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ জমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রস্তুতি কি সত্যিই আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য, নাকি নিজের রাজনৈতিক চেয়ার বাঁচানোর শেষ চেষ্টা?

খবর বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ-এর আগের প্রস্তুতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধবিমান প্রস্তুত, ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত, নৌবহর প্রস্তুত। শুধু একটি নির্দেশের অপেক্ষা। অথচ এই তৎপরতার পেছনে আমেরিকান জনগণের স্বার্থ কতটা জড়িত, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান, যার নেতৃত্বে আছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তেহরান বারবার প্রমাণ করেছে, হুমকিতে তারা মাথা নত করে না। বরং আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত থাকে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই নাকি মতভেদ স্পষ্ট। অনেক উপদেষ্টা মনে করছেন, যুদ্ধের দিকে এগোনো মানে নির্বাচনের আগে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। সেখানে পরাজিত হলে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

মার্কিন অর্থনীতি এখন চাপে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ—এসবই রিপাবলিকান জনপ্রিয়তাকে নিচের দিকে টেনে নামাচ্ছে। আদালত সম্প্রতি ট্রাম্পের আরোপিত বৈশ্বিক শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করায় তার নেতৃত্ব আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে ট্রাম্প কার্যত মুকুটহীন রাজার মতো হয়ে পড়বেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তিনি নিজেই প্রকাশ্যে সেই আশঙ্কার কথা বলেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন কি তাহলে একটি রাজনৈতিক কৌশল? যুদ্ধের আবহ তৈরি করে কি অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা? ইতিহাস বলছে, অনেক নেতাই অভ্যন্তরীণ সংকট আড়াল করতে বাইরের শত্রু তৈরি করেছেন।

কিন্তু ইরান কোনো দুর্বল রাষ্ট্র নয়। এটি ভেনেজুয়েলা নয়, এটি ইরাক নয়। সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রভাব, কৌশলগত অবস্থান—সব মিলিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। যেকোনো সংঘাত গোটা অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে।

ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে কি সেই নীতি মানা হচ্ছে? আমেরিকান ভোটাররা চেয়েছিলেন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, চেয়েছিলেন বিদেশি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত থাকা। অথচ এখন আবার যুদ্ধের সুর।

হোয়াইট হাউসের ভেতরেও নাকি ঐক্য নেই। অনেক কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, ইরান ইস্যুতে কঠোর অবস্থান দোদুল্যমান ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করবে। অর্থনৈতিক ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরে গেলে নির্বাচনী ফল ভয়াবহ হতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়, এটি ট্রাম্পের প্রথম দুই বছরের শাসনের ওপর গণভোট। জনগণ যদি মনে করে তাদের জীবনমান উন্নত হয়নি, তবে সেই অসন্তোষ সরাসরি ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত হবে।

ইরান ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে জবাব হবে কঠোর। অতীতে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর তেহরান যে বার্তা দিয়েছিল, তা ছিল স্পষ্ট—আক্রমণ মানেই প্রতিশোধ।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে তৈরি কৌশলগত সমীকরণ এখন পুরো অঞ্চলের শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কিন্তু ইরান বলছে, তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে।

যদি কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় রিপাবলিকানরা, তবে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়বে। ডেমোক্র্যাটরা সংসদীয় তদন্ত শুরু করতে পারবে। প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো একের পর এক পর্যালোচনার মুখে পড়বে।

অভিশংসনের সম্ভাবনা তখন আর কল্পনা থাকবে না, বাস্তব হুমকি হয়ে উঠবে। ট্রাম্প নিজেও তার সমর্থকদের সতর্ক করেছেন—নির্বাচনে জিততেই হবে, না হলে রাজনৈতিক প্রতিশোধ শুরু হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ কি নির্বাচনী জয় নিশ্চিত করতে পারে? নাকি উল্টো জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে? জনমত জরিপ বলছে, আমেরিকান জনগণ আরেকটি বিদেশি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়।

ইরানের অবস্থান এখানে দৃঢ়। তারা বলছে, ন্যায্য ও সম্মানজনক চুক্তি সম্ভব, কিন্তু চাপিয়ে দেওয়া শর্ত নয়। শক্তির ভাষা বুঝলেও, আত্মসম্মান বিসর্জন দেবে না তেহরান।

বিশ্ব রাজনীতির এই মোড়ে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, অহংকার আর কৌশলের লড়াই চলছে। একদিকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হিসাব, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, ইতিহাস সাক্ষী থাকবে। যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার, কূটনৈতিক সম্পর্ক—সবই কাঁপবে।

আর যদি নির্বাচনেই বড় ধাক্কা আসে, তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তায় পড়বে। ২০২৮ সালের রাজনীতিতেও তার প্রভাব কমে যেতে পারে।

তাই আজকের প্রশ্ন একটাই—ইরানকে ঘিরে এই উত্তেজনা কি সত্যিই নিরাপত্তার জন্য, নাকি ক্ষমতার জন্য? উত্তর সময় দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ইরান মাথা নত করবে না।

দর্শক, মনে রাখবেন—“অহংকার পতনের মূল।” শক্তির দম্ভ যত বড়ই হোক, ইতিহাসে টিকে থাকে সেই জাতি, যারা নিজের মর্যাদা রক্ষায় অটল থাকে। আজকের বিশ্বরাজনীতিতে ইরান সেই অটল অবস্থানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।