ঢাকা, শনিবার, মে ৩০, ২০২৬ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Logo
logo

জাতিসংঘের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন, কালো তালিকায় ইসরাইল!


আনন্দ খবর ডেস্ক    | প্রকাশিত:  ২৯ মে, ২০২৬, ১০:০৫ এএম

জাতিসংঘের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন, কালো তালিকায় ইসরাইল!

সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েলকে কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতিসংঘ। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জাতিসংঘ মহাসচিবের কার্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। বিষয়টি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা সম্পর্কিত জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্ষিক প্রতিবেদনে ইসরায়েলকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই বিষয়টি সামনে আসায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এক ভিডিও বার্তায় জানান, মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কার্যালয়ের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে যৌন সহিংসতা ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা অন্যায্য এবং ভিত্তিহীন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইসরায়েলকে হামাসের সঙ্গে একই তালিকায় রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।

পরবর্তীতে জাতিসংঘে ইসরায়েলের স্থায়ী মিশন এক বিবৃতিতে জানায়, গুতেরেস মহাসচিবের দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত তার কার্যালয়ের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ রাখা হবে না। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে জাতিসংঘকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ তোলে।

অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক জানান, তারা ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তবে মহাসচিবের পক্ষ থেকে সংলাপের দরজা এখনো খোলা রয়েছে।

জাতিসংঘের নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক রীম আলসালেম এ সিদ্ধান্তকে বহুদিনের প্রত্যাশিত পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার বহু অভিযোগ স্বাধীনভাবে নথিভুক্ত ও যাচাই করা হয়েছে। সে কারণে ইসরায়েলকে তালিকাভুক্ত করা আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল।

প্রসঙ্গত, গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর যৌন সহিংসতার বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগার ও আটককেন্দ্রগুলোতে তদন্তকারীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যদিও ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের তদন্তের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেননি।

দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিরা নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগ করে আসছেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের পর গাজা থেকে আটক ব্যক্তিদের বহু সাক্ষ্যে একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এসব অভিযোগ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহত্তর ও ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ।

সম্প্রতি পশ্চিম তীর সুরক্ষা জোটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত যৌন সহিংসতা এবং লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতনের কারণে অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

এছাড়া গাজাগামী একটি ত্রাণবাহী জাহাজে থাকা কয়েকজন বিদেশি কর্মীও অভিযোগ করেছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক হওয়ার পর মুক্তিপ্রাপ্ত কর্মীদের অনেকে যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তত পনেরটি পৃথক যৌন নির্যাতনের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনেরও প্রতিবাদ জানিয়েছিল তেল আবিব। ওই প্রতিবেদনে একাধিক ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছিল। ইসরায়েল সরকার অভিযোগগুলো অস্বীকার করে এবং প্রকাশনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘ ও ইসরায়েলের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই টানাপোড়েনের মধ্যে থাকলেও ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গাজায় চলমান সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এসব সমালোচনার জবাবে ইসরায়েল বারবার জাতিসংঘকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করেছে।

সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক তদন্ত, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগীদের ধারাবাহিক সাক্ষ্যকে অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা ইসরায়েলি নীতির একটি পুনরাবৃত্ত বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। তারা মনে করেন, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তে সহযোগিতা করার পরিবর্তে সমালোচনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করে, তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাবিত।

বর্তমানে জাতিসংঘের কালো তালিকাভুক্তির বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এর ফলে ইসরায়েল ও জাতিসংঘের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।