একটি পুরনো প্রবাদ আছে—'পাপ বাপকেও ছাড়ে না'। মধ্যপ্রাচ্যে দশকের পর দশক ধরে অশান্তি ছড়িয়ে আসা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কি এবার চূড়ান্ত পতনের সময় ঘনিয়ে এল? আমেরিকার দম্ভের প্রতীক বিশ্বের বৃহত্তম রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডকে এখন ইরানের দোরগোড়ায় পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প। কিন্তু খোদ মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাই বলছেন, এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। ইরানের অজেয় ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির সামনে এই বিশাল জাহাজটি কি কেবলই একটি ভাসমান কফিন হয়ে দাঁড়াবে? চলুন জেনে নেই নেপথ্যের আসল রহস্য।
পাপ বাপকেও ছাড়ে না—এই চিরন্তন সত্যটিই আজ যেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে দখলদারিত্ব ও অন্যায় আগ্রাসন চালিয়ে আসা আমেরিকা আজ নিজেই নিজের জালে জড়িয়ে পড়ছে। ইরানের দৃঢ়চেতা অবস্থান এবং ইসরায়েলি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তেহরানের অকুতোভয় হুংকার আজ হোয়াইট হাউসের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ট্রাম্পের একরোখা জেদে মার্কিন নৌবাহিনী এখন মহাবিপদ সংকেত দিচ্ছে।
আমেরিকার দম্ভের প্রতীক বিশ্বের সর্ববৃহৎ রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডকে এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে। অথচ এই বিশাল জাহাজটি দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত। খোদ মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল এই মিশনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন, এই বাহিনীকে আর ব্যবহার করা মানেই তাদের নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এবং বড় বিপর্যয় ডেকে আনা।
ইরানের অপ্রতিরোধ্য সামরিক সক্ষমতা এখন আর কারো অজানা নেই। তেহরানের হাতে থাকা অত্যাধুনিক হাইপারসনিক মিসাইল এবং নির্ভুল ড্রোন প্রযুক্তি আমেরিকার যেকোনো রণতরীকে মুহূর্তের মধ্যেই সাগরের তলদেশে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম। ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ট্রাম্প এখন নিজের দেশের গর্ব এই রণতরীকে ইরানের টার্গেটে পরিণত করছেন। অ্যাডমিরাল কডল বারবার সতর্ক করেছিলেন যে, এই বর্ধিত মোতায়েন কর্মীদের ওপর অসহ্য চাপ তৈরি করবে।
মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান কর্মকর্তার হুশিয়ারি সত্ত্বেও ট্রাম্পের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, তারা কতটা মরিয়া। ভেনেজুয়েলায় ব্যর্থ অভিযান এবং সেখানে ক্লান্ত হওয়ার পর এখন ইরানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখাচ্ছে ওয়াশিংটন। অ্যাডমিরাল কডল সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ফোর্ড রণতরীটি সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন আছে। এর চেয়ে বেশি সময় সমুদ্রে থাকা মানেই জাহাজটির ইঞ্জিনে বড় ধরনের যান্ত্রিক বিকলতা।
আসলে আমেরিকার এই রণতরী মোতায়েন করার মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানকে চাপে রাখা। কিন্তু ইরান সেই হুমকিকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজেদের আকাশ ও জলসীমাকে দুর্ভেদ্য করে তুলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন ভাবছে তারা ইরানকে ভয় দেখাতে পারবে, কিন্তু বাস্তবতা হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর মার্কিন দাদাগিরি মানতে নারাজ। ইরানের এই বিজয়ী মনোভাব সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে আজ আবির্ভূত হয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান উদ্বেগ হলো, যদি এই যুদ্ধ শুরু হয় তবে ফোর্ড রণতরী আর বন্দরে ফিরে আসতে পারবে না। জাহাজটির পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ইঞ্জিনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এখন অকেজো প্রায়। অ্যাডমিরাল কডল গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি এই অতিরিক্ত সময় মোতায়েনের ঘোর বিরোধী। কারণ এটি শুধু জাহাজের ক্ষতি নয়, বরং চার হাজার মার্কিন সেনার জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।
অন্যদিকে ইসরায়েল পিছন থেকে ট্রাম্পকে উস্কানি দিচ্ছে যাতে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের সংঘাত বাধে। তারা চায় আমেরিকান রক্ত দিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে। কিন্তু তেহরানের শক্তিমত্তা দেখে খোদ পেন্টাগনের ভেতরেই এখন গৃহবিবাদের সুর শোনা যাচ্ছে। অনেক সামরিক বিশ্লেষক মনে করছেন, ফোর্ড রণতরীকে ইরানের কাছাকাছি পাঠানো মানে হলো বাঘের গুহায় ছাগল পাঠিয়ে দেওয়ার মতো একটি হাস্যকর ও আত্মঘাতী সামরিক প্রচেষ্টা।
আমেরিকার গর্বের এই রণতরীটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর ড্রাইডক মেইনটেইনেন্সের সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। ভার্জিনিয়া বন্দরে মেরামতের পরিবর্তে এটিকে এখন যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অ্যাডমিরাল কডল বারবার বলেছেন, মানুষের জীবনের ওপর এই ধরনের জুলুম কখনোই ভালো ফল বয়ে আনবে না। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এখন শুধু ইসরায়েলকে খুশি করার এজেন্ডা নিয়েই সামনের দিকে এগুচ্ছে যা অশুভ।
ইরানি সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে তাদের ভূগর্ভস্থ মিসাইল সিটি এবং নৌ-মহড়া দিয়ে আমেরিকাকে কড়া বার্তা দিয়েছে। পারস্য উপসাগর এখন আর মার্কিন রণতরীর জন্য নিরাপদ কোনো খেলার মাঠ নয়। ইরানের প্রতিটি মিসাইল এখন আমেরিকার এই রণতরীর ওপর লক করা আছে। ট্রাম্পের কথিত এই 'আর্মাদা' ইরানের শক্তির সামনে বালির বাঁধের মতো ধসে পড়বে। ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে এমন করুণ দশা আগে কখনও দেখা যায়নি। অ্যাডমিরাল কডল যখন 'পুশ ব্যাক' বা বাধা দেওয়ার কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে পরিস্থিতি কতটা গম্ভীর। রণতরী ফোর্ড এখন সমুদ্রের মাঝখানে আটকা পড়েছে, যেখানে না আছে পর্যাপ্ত রসদ, না আছে যুদ্ধ জয়ের মনোবল। ট্রাম্পের এই একগুঁয়েমি আমেরিকার সামরিক ইতিহাসকে এক লজ্জাজনক পরাজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
ইসরায়েল ও আমেরিকার এই যৌথ আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করার চূড়ান্ত পাঁয়তারা। কিন্তু তারা ভুলে গেছে যে এটি বিংশ শতাব্দী নয়। আজকের ইরান পরমাণু প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ এবং তাদের ড্রোন এখন সারা বিশ্বে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। মার্কিন রণতরী জেরাল্ড আর. ফোর্ড যখন মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করবে, তখন তাকে কেবলই একটি বড় টার্গেট হিসেবে গণ্য করবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।
অ্যাডমিরাল কডল তার সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক চাপে সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা হবে চরম বোকামি। তিনি নাবিকদের পরিবার ও তাদের জীবনের সুরক্ষার দাবি তুলেছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউস এখন এসব মানবিক আবেদনের চেয়ে অস্ত্রের দম্ভকেই বড় করে দেখছে। আমেরিকার এই অমানবিক আচরণ তাদের নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যেই বড় ধরনের বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে যা খুবই আসন্ন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানেই হলো তেলের বিশ্ববাজার ধ্বংস হওয়া এবং আমেরিকার অর্থনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া। ট্রাম্পের এই রণতরী মিশন সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের চূড়ান্ত পতন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ইরানের সাহসী যোদ্ধারা এখন প্রস্তুত আছেন তাদের জলসীমা রক্ষা করতে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সাগরে ডুবিয়ে দিতে।
শেষে বলা যায়, জুলুমবাজদের পতন সবসময়ই অত্যন্ত করুণ হয়। আমেরিকা ও ইসরায়েল যেভাবে ইরানকে ঘিরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে, তার জবাব তেহরান বীরত্বের সাথেই দেবে। জেরাল্ড আর. ফোর্ড রণতরীটি এখন মার্কিনীদের জন্য একটি বোঝার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি আর জরাজীর্ণ মনোবল নিয়ে তারা কোনোভাবেই ইরানের অজেয় শক্তির সামনে টিকতে পারবে না। এটাই হবে আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
সারা বিশ্ব আজ দেখছে কীভাবে একটি অহংকারী শক্তি নিজেদের ধ্বংসের পথে হাঁটছে। ইরানের ধৈর্য ও রণকৌশল আজ সাম্রাজ্যবাদীদের পরাজিত করতে সক্ষম। আমেরিকার উচিত তাদের রণতরী ঘরে ফিরিয়ে নেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ করা। তা না হলে, ইতিহাসের পাতায় তারা শুধু পরাজিত শক্তি হিসেবেই থেকে যাবে। ইরান আজ বিজয়ী, এবং ন্যায়ের পথে তাদের এই সংগ্রাম অবশ্যই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করবে।
দর্শক, ট্রাম্পের এই পাগলামি কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে? নাকি ইরানের শক্তিতে পিছু হটতে বাধ্য হবে আমেরিকা? আপনার মতামত কমেন্টে জানান।
