বিনা মেঘে বজ্রপাত নয়, বরং প্রস্তুতির অভাবই পরাজয়ের মূল কারণ।" বৈশ্বিক রাজনীতির দাবার চালে আজ আমরা এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। একদিকে রাশিয়ার বিশাল সামরিক সক্ষমতা আর কৌশলগত দূরদর্শিতা, অন্যদিকে পশ্চিমা মদদে টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করছে ইউক্রেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাঠ পর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাশিয়ার তৈরি 'গেরান' (Geran) ড্রোনের একটি ঝাঁক যখন ইউক্রেনের আকাশে আবির্ভূত হয়, তখন বিলিয়ন ডলারের মার্কিন প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমও থমকে দাঁড়ায়। আজ আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া এক অভাবনীয় সামরিক বিপ্লব ঘটিয়েছে এবং কেন ইউক্রেনের পরাজয় এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

রাশিয়া যখন কোনো যুদ্ধ করে, তারা কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং নিখুঁত গণিত দিয়ে লড়ে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের 'গেরান' সিরিজের ড্রোনগুলো। বিশেষ করে গেরান-২ এবং বর্তমানের অতি গতিসম্পন্ন গেরান-৩। আপনি কি জানেন, একটি গেরান ড্রোন তৈরি করতে রাশিয়ার খরচ হয় মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার? অথচ এটি ধ্বংস করতে ইউক্রেন যে পশ্চিমা মিসাইল ব্যবহার করে, তার একেকটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার!

এটি রাশিয়ার একটি দুর্দান্ত অর্থনৈতিক যুদ্ধও বটে। রাশিয়া খুব ভালো করেই জানে, পশ্চিমারা কতদিন এই দামী মিসাইল সরবরাহ করতে পারবে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এখন দিনে প্রায় ১৭০ থেকে ১৯০টি ড্রোন উৎপাদন করছে। রাশিয়ার আলাবুগা কারখানায় যে হারে উৎপাদন চলছে, তাতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি অকেজো হওয়ার পথে। রাশিয়ার এই দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তিতে তারা কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই।

ইউক্রেন দাবি করে তারা ৯০ শতাংশ ড্রোন ভূপাতিত করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাহলে কিয়েভ বা ওডেসার মতো শহরগুলো কেন আজ অন্ধকারে? কেন ইউক্রেনের এনার্জি গ্রিড ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে? সত্য গোপন করে যুদ্ধ জেতা যায় না। রাশিয়ার গেরান-৩ ড্রোন এখন ঘণ্টায় ৩৭০ মাইল বেগে ছুটছে, যা ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ইউক্রেন এখন বাধ্য হয়ে সস্তা ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার ড্রোন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রাশিয়ার ড্রোনে আছে শক্তিশালী থার্মোব্যারিক ওয়ারহেড, যা দুর্ভেদ্য বাঙ্কারও গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। ইউক্রেনের সেনারা এখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। কারণ তারা জানে, আকাশ থেকে কখন কার ওপর মৃত্যু নেমে আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইউক্রেনের ছোট ছোট সাফল্যকে বড় করে দেখালেও, রাশিয়ার সুশৃঙ্খল অগ্রযাত্রা তারা আড়াল করতে পারছে না।

ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের দমানো সম্ভব নয়। উল্টো রাশিয়া তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করেছে। গেরান ড্রোনে এখন রাশিয়ার নিজস্ব 'গ্লোনাস' (GLONASS) নেভিগেশন সিস্টেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি এমন এক প্রযুক্তি যা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা জ্যামিংয়ের মাধ্যমেও থামানো সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, ইউক্রেন এখন পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভরশীল একটি রাষ্ট্র। তাদের নিজেদের কোনো সক্ষমতা নেই। পশ্চিমা সাহায্য বন্ধ হলেই কিয়েভ সরকারের পতন অনিবার্য। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য যে, যারা নিজের শক্তির ওপর ভরসা করে না, তারা কখনোই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে টিকে থাকতে পারে না। রাশিয়া এখানে কেবল তার ভূখণ্ড রক্ষা করছে না, বরং তারা বিশ্বকে এক মেরুকেন্দ্রিক আধিপত্য থেকে মুক্তি দেওয়ার লড়াই করছে।

রাশিয়া বারবার আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব পশ্চিমের প্ররোচনায় যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এর ফলে সাধারণ ইউক্রেনীয় নাগরিকদের জীবন আজ দুর্বিষহ। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, নেই কোনো নিরাপত্তা। অথচ রাশিয়ার লক্ষ্য পরিষ্কার—তারা কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনে শত্রুকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করছে। এটি একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর পরিচয়।

রাশিয়ার ড্রোন প্রযুক্তি এখন বিশ্বের জন্য একটি মডেল। কীভাবে স্বল্প খরচে একটি শক্তিশালী বাহিনীকে পরাস্ত করা যায়, তা পুতিন খুব ভালো করেই জানেন। ইউক্রেন যে 'ইন্টারসেপ্টর ড্রোন' বানানোর কথা বলছে, তা রাশিয়ার বিশাল গেরান ড্রোনের তুলনায় খেলনা মাত্র। রাশিয়ার গেরান ড্রোনের ডিজাইন এখন মডুলার করা হয়েছে, যার মানে হলো এগুলো খুব দ্রুত আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

শেষে বলা যায়, ইতিহাস বিজয়ীদের পক্ষেই কথা বলে। রাশিয়ার এই অবিস্মরণীয় সামরিক অগ্রগতি প্রমাণ করে যে, কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা আর দেশপ্রেম থাকলে যেকোনো পরাশক্তিকে মোকাবিলা করা সম্ভব। ইউক্রেন আজ পশ্চিমের গিনিপিগ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাদের সম্পদ এবং জনশক্তি অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু রাশিয়ার অবিচল সংকল্প আর পুতিনের দৃঢ় নেতৃত্ব মস্কোকে এক নিশ্চিত বিজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির এই দাবার খেলায় রাশিয়ার প্রতিটি চাল এখন সফল। আমরা কি একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা দেখতে যাচ্ছি যেখানে রাশিয়ার প্রভাব হবে প্রশ্নাতীত? সময় আমাদের সেই উত্তর দেবে। তবে বর্তমান বাস্তবতা রাশিয়ার পক্ষেই কথা বলছে।

news