মৌসুমী আক্তার: চাচা আপন প্রাণ বাঁচা! কিন্তু দেশের প্রাণ যখন আজ সংকটে, তখন কি আপনি চুপ থাকবেন? এক স্বৈরাচারকে আমরা রক্ত দিয়ে বিদায় করেছি, কিন্তু দরজায় কি আরেক 'গুপ্ত স্বৈরাচার' কড়া নাড়ছে? ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কি আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? আজ সত্য বলার সময় এসেছে!
কথায় আছে, ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, আর বেইমান চেনার আগেই সময় ফুরিয়ে যায়।’ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের ওপেন স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে বিদায় করেছে। কিন্তু রাজনীতির আকাশে এখন নতুন মেঘের ঘনঘটা। আজ যারা তথাকথিত ইসলামের দোহাই দিয়ে ‘একবার সুযোগ’ চাচ্ছে, তাদের পেছনের আসল উদ্দেশ্য এবং পুরনো ইতিহাস কি আমরা ভুলে গেছি?
জামায়াতে ইসলামী আজ নিজেদের একটি ইসলামী দল হিসেবে দাবি করে ঠিকই, কিন্তু তাদের ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দলটা এখন আসলে হাফেজ বা ক্বারীদের দল নয়, বরং ভুয়া পদবীধারী ডাক্তার আর তথাকথিত অধ্যাপকদের কারখানায় পরিণত হয়েছে। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর চর্চার চেয়ে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। ইসলামের দোহাই দিয়ে তারা আসলে জনগণের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে ক্ষমতার মসনদে বসতে চায়।
আজকের জামায়াতে ইসলামী দেখলে অবাক হতে হয় যে, সেখানে প্রকৃত আলেম বা মুফতি খুঁজে পাওয়াটা খড়ের গাদায় সুঁই খোঁজার মতো কঠিন। তাদের নীতি-নির্ধারকরা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার চেয়েও তথাকথিত আধুনিক পদবী নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। প্রশ্ন জাগে, ইসলাম কি এখন এই তলের পড়া ডক্তর আর ডাক্তারদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে? তলের পড়া বলতে বোঝানো হয়েছে—উপরে আরবি ভাষায় এবং নিচে বাংলা ভাষায় লেখা পবিত্র কোরআন শরীফসহ ইসলামী বিভিন্ন গ্রন্থ। নামে ইসলামকে যারা কেবল রাজনীতির হাতিয়ার বানায়, তারা কি কখনো দেশের মঙ্গল কামনা করতে পারে?
মনে করে দেখুন ১৯৯৬ সালের সেই সময়টির কথা। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ঠিক একই স্লোগান দিয়েছিলেন—‘আমাদের একবার সুযোগ দিন’। ২১ বছরের অপেক্ষার দোহাই দিয়ে জনগণের আবেগ নিয়ে সেবার বিশ্রীভাবে খেলেছিলেন তিনি। সেই একবারের সুযোগ পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশকে কী দিয়েছিলেন? দিয়েছিলেন একদলীয় শাসন, গুম, খুন আর লুটপাটের এক বিভীষিকাময় রাজত্ব। সেই সুযোগই আজ দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আজ ২০২৬ সালেও আমরা ঠিক একই স্ক্রিপ্টের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। এখন জামায়াতের বর্তমান আমির শফিকুর রহমান সাহেবরা ঠিক একই সুরে বলছেন, ‘আমাদের একবার সুযোগ দিন’। যারা একসময় স্বৈরাচারের সাথে হাত মিলিয়েছিল, তাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা কি সত্যিই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য? নাকি এটি পুরনো বিষকে নতুন বোতলে ভরে জনগণের সামনে হাজির করার একটি চতুর অপচেষ্টা মাত্র? ইতিহাস কিন্তু খুব একটা সুখকর নয়।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ১৯৮৬ সালে জাতির সাথে সবচেয়ে বড় বেঈমানি করেছিল এই জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ। স্বৈরাচার এরশাদের পাতানো নির্বাচনকে বৈধতা দিতে তারা সেদিন জোট বেঁধেছিল। যে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি গণতন্ত্রের স্বার্থে, সেখানে জামায়াত ও আওয়ামী লীগ এরশাদের সাথে নির্বাচনে গিয়ে রাজনীতিতে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছিল। এই একাত্মতা স্বৈরাচার এরশাদকে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে বিশাল এক অক্সিজেন সরবরাহ করেছিল সেদিন।
জামায়াতে ইসলামী কখনোই আদর্শিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিল না, তারা সবসময় ক্ষমতার রাজনীতি করতে চেয়েছে। ১৯৮৬ সালের সেই কলঙ্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছিল যে, তারা বিরোধী দলের আপোসহীন রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তাদের লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ভাগীদার হওয়া। এরপর স্লোগান ওঠে—“ছিয়াশির বেইমান চশমা পরা বুবুজান” ও “ছিয়াশির বেইমান টুপিওয়ালা মুনাফেক।” সেই সময় থেকেই সাধারণ মানুষের কাছে মুনাফেক বলতে যেন জামায়াতকেই বোঝানো হতে থাকে। এই মুনাফেকি আজও তাদের রক্তে মিশে আছে।
১৯৯১ সালে ক্ষমতার স্বাদ নেওয়ার আশায় তারা সাময়িকভাবে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ১৯৯৪ সালে আবার পাল্টি মারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তারা সেই সময়কার চরম শত্রু আওয়ামী লীগের সাথে হাত মিলিয়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। রাজপথে আওয়ামী লীগের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করে তারা প্রমাণ করেছিল যে, ক্ষমতার স্বার্থে তারা যেকোনো সময় তাদের নীতি বিসর্জন দিতে এবং শত্রুর সাথে মিত্রতা করতে পারে।
২০০১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন জামায়াত আবার ক্ষমতার ভাগ পেতে জোটে যোগ দেয়। তাদের দুজন প্রভাবশালী নেতা তখন পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। অথচ আজ তারা সেই সরকারের সমালোচনা করছে! সংসদীয় গণতন্ত্রে একে বলা হয় ‘যৌথ দায়বদ্ধতা’। নিজেদের মন্ত্রিত্বের সময়ে হওয়া কোনো ঘটনার দায় কি তারা এড়িয়ে যেতে পারে? আজ তারা যে সুরে কথা বলছে, তা যেন সরাসরি আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা মেশিনের প্রতিধ্বনি মাত্র।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির সূচককে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে আওয়ামী লীগ এক যুগ ধরে বিএনপিকে হেয় করার চেষ্টা করেছে। আজ ঠিক সেই একই ভাষায় কথা বলছে জামায়াতে ইসলামী। তারা কি ভুলে গেছে যে সেই সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ তারাও ছিল? নিজেদের আমলের সাফল্যকে অস্বীকার করে তারা আসলে কাদের খুশি করতে চায়? এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে তারা রাজনৈতিকভাবে চরম অদূরদর্শী এবং আদর্শহীন এক দল।
২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়ও জামায়াতের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের পাতানো নির্বাচনকে বৈধতা দিতে তারা বিএনপির সাথে পল্টি মারার উপক্রম করেছিল। তারা এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পাঁয়তারা করেছিল যাতে ষড়যন্ত্রকারীরা জয়ী হতে পারে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপদের সময় তারা মিত্রকে ত্যাগ করে নিজেদের সুবিধা খুঁজতে সবসময় ব্যস্ত থাকে। এই বেইমানির ইতিহাস বাংলার মানুষ কখনো মুছে ফেলতে পারবে না।
আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সম্পর্ক ছিল ওপেন বা প্রকাশ্য, কিন্তু জামায়াত এখন ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ছে গোপনে। এমনকি তারা বলছে যে ভারতের সাথে বৈঠকের বিষয়টি দিল্লি গোপন রাখতে বলেছে। যে দল দেশের সার্বভৌমত্বের কথা বলে, তারা কেন ভিনদেশি শক্তির সাথে এমন লুকোচুরি খেলছে? জামায়াত কি তবে কোনো নতুন ‘গুপ্ত স্বৈরাচার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য তলে তলে প্রস্তুতি নিচ্ছে? দেশপ্রেমিক জনতা এটা জানতে চায়।
বিপরীতে আমরা দেখি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিকে। শত জুলুম, হুলিয়া আর হাজার হাজার নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের পরও বিএনপি কখনো দেশের মানুষের সাথে বেইমানি করেনি। তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বিএনপি আজও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে আপোসহীন। বিএনপি কখনোই ক্ষমতার জন্য বিদেশের কাছে মাথা নত করেনি কিংবা পর্দার আড়ালে কোনো গোপন আঁতাত করেনি। বিএনপির মূল শক্তি হচ্ছে এই দেশের সাধারণ মেহনতি মানুষ এবং তাদের ভালোবাসা।
ওপেন স্বৈরাচারকে আমরা হটিয়েছি ঠিকই, কিন্তু সাবধান থাকতে হবে যেন কোনো ‘গুপ্ত স্বৈরাচার’ আমাদের ওপর চেপে না বসে। ধর্মকে ঢাল বানিয়ে যারা ক্ষমতায় আসতে চায়, তাদের আসল চেহারা চিনে রাখুন। ১৯৮৬ সালের বেইমান বা ১৯৯৬ সালের সেই সুযোগ সন্ধানী আওয়ামী লীগ যেন নতুন কোনো মোড়কে ফিরে না আসে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
আসুন আমরা শপথ নেই, ইতিহাসের ভুল আর করব না। তথাকথিত ‘এক সুযোগ’ চাওয়ার আড়ালে যারা দেশকে আবার অন্ধকারে নিতে চায়, তাদের লাল কার্ড দেখানোর সময় এসেছে। বাংলাদেশ হবে কেবল বাংলাদেশীদের জন্য, কোনো গোপন আঁতাতকারী বা বেইমানদের জন্য নয়। ইনশাআল্লাহ, গণতন্ত্রের বিজয় হবেই, সত্যের জয় হবেই। দেশপ্রেমিক জনতার জয় সুনিশ্চিত। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। বিএনপির নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
